মহাকাশের জন্য প্রস্তুত দেশের প্রথম ন্যানো স্যাটেলাইট “অন্বেষা ৩বি”

বাংলাদেশের প্রথম ন্যানো স্যাটেলাইট অন্বেষা ৩বি

বার্ডস প্রজেক্ট-এ কয়েকটি দেশের ন্যানো স্যাটেলাইট বানানোর কাজ শুরু হয়। দেশগুলো হচ্ছে- জাপান, ঘানা, মঙ্গোলিয়া, নাইজেরিয়া এবং বাংলাদেশ।(bangladesh first nno satellite onnesha 3b ready to fly) প্রতিটি ন্যানো স্যাটেলাইটের আকার দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতায় ১০ সেন্টিমিটার আর ভর ১ কেজির মতো। এই প্রকল্পের প্রধান কাজ হচ্ছে দেশগুলোর জন্য মানবসম্পদ তৈরি করা, যারা পরে তাদের দেশে থেকেই পরবর্তী কৃত্রিম উপগ্রহ তৈরিতে মনোযোগী হতে পারবেন।

ন্যানো স্যাটেলাইট অন্বেষা ৩বি টিমের ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহিল কাফি, মাইসুন ইবনে মনোয়ার এবং রায়হানা শামস ইসলাম অন্তরা।

কিউব-সাইটেলাইটের উপরে ইতোমধ্যেই জাপানের কিউসু ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি-তে গবেষণার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহিল কাফি, মাইসুন ইবনে মনোয়ার এবং রায়হানা শামস ইসলাম অন্তরা। দেশে গ্রাউন্ড স্টেশনের কাজ শেষ করেছে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের মোহাম্মদ সৌরভের নেতৃত্বে আরেকটি দল।

যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা থেকে মহাকাশযান নির্মাতা প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স-এর ফ্যালকন ৯ রকেটে করে ২ জুন মহাকাশে যাওয়ার কথা ছিল বাংলাদেশের তৈরি প্রথম ন্যানো স্যাটেলাইট ‘ব্র্যাক অন্বেষা’। কিন্তু খারাপ আবহাওয়ার কারণে সময় পিছিয়ে বাংলাদেশ সময় ৪ জুন মধ্যরাত ৩টায় নতুন সময় নির্ধারণ করা হয়েছে।

মাইসুন ইবনে মনোয়ার তার সাইটে উল্লেখ করেন, অন্বেষা ৩বি-এর প্রধান কাজ ছয়টি।

১। ক্যামেরা মিশন- স্যাটেলাইট থেকে বাংলাদেশের ছবি নেওয়া।

২। এসএনজি মিশন- স্যাটেলাইট থেকে অডিও ডাউনলোড করার সুবিধা, যা তরুণ প্রজন্মকে মহাশূন্য বিজ্ঞানের দিকে ধাবিত করবে।

৩। এসইএল- মহাকাশের পরিবেশ ও পরিস্থিতির পর্যবেক্ষণ ও তথ্য প্রদান।

৪। পিওএস- স্যাটেলাইটের অবস্থান নির্ণয়।

৫। এটিএম- বায়ুমণ্ডল পর্যবেক্ষণ।

৬। এনইটি- ভূ-উপগ্রহকেন্দ্র তৈরি ও ব্যবহার উপোযোগী জ্ঞান অর্জন।

এ প্রকল্পে দলে সবার কাজ ভাগাভাগি করা হল। মাইসুন পেলেন গ্রাউন্ড স্টেশন কমিউনিকেশন (৯৬০০ বিপিএস), কাফি পেলেন ডিগি-সিঙ্গার (এর মাধ্যমে মহাশূন্য থেকে সঙ্গীত প্রচার করা হবে) আর সিঙ্গেল ইভেন্ট ল্যাচ-আপ (এসইএল) এবং অন্তরা পেলেন অ্যান্টেনা ডিপ্লয়মেন্ট চ্যালেঞ্জ। তিন শিক্ষার্থী রাত-দিন গবেষণাগারে কাজ করা শুরু করে দিলেন।

দেশে বিটিআরসি থেকে গ্রাউন্ড স্টেশন পরিচালনার অনুমোদন পাওয়া যায়, বাংলাদেশ ব্যাংক টাকা ছাড় দিতে রাজি হয়, ব্র্যাকও অর্থ পাঠাতে প্রস্তুত হয়। ওদিকে তিন শিক্ষার্থী ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র থেকে কৃত্রিম উপগ্রহ পর্যন্ত যোগাযোগের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল কমিউনিকেশনস কমিশন থেকে আন্তর্জাতিক সনদ (অ্যামেচার ব্যান্ড জিএস অপারেশন লাইসেন্স) পেয়েছেন। ধীরে ধীরে ন্যানো স্যাটেলাইটের প্রোটোটাইপ থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং মডেল তৈরি করা হয়, সম্পন্ন হয় এর পরীক্ষাও। এর মধ্যে ড. আরিফুর নাসা’র অর্থায়নে চালিত সিএসইটিআর নামের একটি কেন্দ্রে ন্যানো স্যাটেলাইট নিয়ে কাজ করতে চলে যান।

২০১৭ সালের ২৫ মে ব্র্যাক বিশ্বদ্যিালয়ের মহাখালী ক্যাম্পাসের ৪ নম্বর ভবনের ছাদে ব্র্যাক অন্বেষা ন্যানো স্যাটেলাইটের গ্রাউন্ড স্টেশন উদ্বোধন করেন ব্র্যাক চেয়ারপারসন ফজলে হাসান আবেদ। গ্রাউন্ড স্টেশনটির উদ্বোধন শেষে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “বাংলাদেশে গবেষণার ক্ষেত্রে খুব বেশি বিনিয়োগ করা হয় না। আমরা এখনও মনে করি, পৃথিবীর উন্নত দেশগুলো রিসার্চ করবে আর আমরা এর ফলাফল ভোগ করব।”

অন্বেষা ৩বি এর গ্রাউন্ড স্টেশন

এ গ্রাউন্ড স্টেশন নির্মাণ দলে প্রিন্সিপাল ইনভেস্টিগেটর ছিলেন ড. খলিলুর, ইনভেস্টিগেটর হিসেবে কাজ করেন ব্র্যাক বিশ্বিবিদ্যালয়ের বৈদ্যুতিক ও তড়িৎ প্রকৌশল বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হাসানুজ্জামান সাগর। দলের সদস্যদের তিনটি ভাগ রয়েছে। প্রতিষ্ঠাতা সদস্যরা হলেন- দলনেতা মোহাম্মদ সৌরভ, বিজয় তালুকদার, আয়নাল হুদা এমিল আর সানান্দ জগতি চয়ন। প্রথম প্রজন্মের সদস্যরা হলেন- আরাফাত হক, জামিল আরিফিন। দ্বিতীয় প্রজন্মের সদস্যরা হলেন- মো. শাকিল, আদনান সাব্বির, মো. মাহবুবুল আলম ও শাহরিয়ার হাসান পরশ।

গ্রাউন্ড স্টেশন চালুর পর অন্য আরেকটি স্যাটেলাইট থেকে এতে ডেটা গ্রহণ করা হয়। সম্প্রতি হয়ে যাওয়া ঘূর্ণিঝড় মোরা’র ছবিও পাওয়া যায়। কিন্তু আবহাওয়া বিষয়ে খুব একটা জ্ঞান না থাকায় তা স্পষ্টভাবে বুঝতে পারেননি বলে জানান আরাফাত।

অন্বেষা ৩বি হস্তান্তর

২০১৭ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি তাদের তৈরি করা ন্যানো স্যাটেলাইট মহাকাশে উৎক্ষেপণের জন্য জাপান অ্যারোস্পেস এক্সপ্লোরেশন এজেন্সির (জাক্সা) কাছে হস্তান্তর করা হয়। সেদিন দুপুরে কিউসু ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলোজিতে স্যাটেলাইটটি হস্তান্তর অনুষ্ঠান ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের মহাখালী ক্যাম্পাসে সরাসরি সম্প্রচার করা হয় ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে। এটি হস্তান্তর করেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক সৈয়দ সাদ আন্দালিব এবং কিউসু ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলোজির প্রেসিডেন্ট ইউজি অই। এ সময় সেখানে আরও উপস্থিত ছিলেন কিউটেক ল্যাবরেটরি অব স্পেসক্র্যাফট এনভায়রনমেন্ট ইন্টারকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের পরিচালক মেংগু চো, ড. মো. খলিলুর রহমান এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন শিক্ষার্থী। ওই অনুষ্ঠানে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য সৈয়দ সাদ আন্দালিব বলেন, “আমাদের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল, এই প্রযুক্তিটা শিখে নেওয়া, কেননা পরবর্তীতে যেন আমাদের শিক্ষার্থীরা নিজেরাই স্যাটেলাইটের ডিজাইন থেকে শুরু করে সামগ্রিক কাজটা নিজেরাই করতে পারে। সেটাই আমরা শুরু করলাম।”

ন্যানো স্যাটেলাইটটি ফ্যালকন ৯-এ করে আন্তর্জাতিক স্পেস স্টেশনে পাঠানোর পর, সেখান থেকে তা কক্ষপথে স্থাপন করা হবে। কক্ষপথে পৌঁছানোর পর ন্যানো স্যাটেলাইটের প্রথম কাজ হবে আমাদের জাতীয় সংগীত বাজানো জানালেন অন্বেষা ৩বি টিম এর সৌরভ ।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY